বাংলাদেশের ক্রিকেট দলের র্যাঙ্কিং: ওডিআই, টেস্ট ও টি-টোয়েন্টি সহজভাবে বুঝুন
আইসিসি র্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তিন ফরম্যাটে তিন রকম চিত্র দেখায়। টেস্টের তুলনায় টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে ওপরের দিকে রয়েছে।
র্যাঙ্কিং পয়েন্ট কীভাবে কাজ করে, সেটা বুঝতে পারলে সহজেই বোঝা যায় কেন মাত্র একটি সিরিজের ফলেই টাইগাররা কয়েক ধাপ ওপরে বা নিচে চলে যেতে পারে। আর শুধু র্যাঙ্কিংয়ে কত নম্বরে আছে সেটাই নয়, দলের রেটিং কত—সেটাও খেয়াল করা গুরুত্বপূর্ণ।
এই মুহূর্তে বাংলাদেশের অবস্থান
সর্বশেষ আইসিসি র্যাঙ্কিং আপডেট অনুযায়ী বাংলাদেশ:
- টেস্টে ৭৩ রেটিং নিয়ে ৯ম
- ওডিআইতে ৮৩ রেটিং নিয়ে ৯ম
- টি-টোয়েন্টিতে ২২৪ রেটিং নিয়ে ৮ম
প্রতিটি সিরিজ শেষ হওয়ার পর এই সংখ্যাগুলো পরিবর্তিত হতে পারে।
বাংলাদেশে তিন ফরম্যাটের জন্য আলাদা অধিনায়ক রয়েছে। টেস্ট দলের নেতৃত্বে নাজমুল হোসেন শান্ত, ওডিআই দলের অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ এবং টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক দলের অধিনায়ক লিটন দাস। প্রধান কোচ হিসেবে রয়েছেন ফিল সিমন্স।
লাল বলের ও সাদা বলের ক্রিকেটের আলাদা চাহিদা সামলাতে এখন অনেক জাতীয় দলই এভাবে আলাদা অধিনায়ক রাখে। এতে একজন অধিনায়ক তিনটি ফরম্যাট একসঙ্গে সামলানোর বদলে নির্দিষ্ট ফরম্যাটের কৌশল ও চাহিদার ওপর বেশি মনোযোগ দিতে পারেন।
আইসিসি র্যাঙ্কিং আসলে কীভাবে কাজ করে?
আইসিসি র্যাঙ্কিং শুধু কত ম্যাচ জিতল আর কত ম্যাচ হারল—এমন সাধারণ হিসাব নয়।
প্রতিটি সিরিজের ফল এবং প্রতিপক্ষ কতটা শক্তিশালী, সেটার ভিত্তিতে একটি দল পয়েন্ট পায়। এরপর খেলা ম্যাচের সংখ্যার সঙ্গে হিসাব করে তৈরি হয় দলের রেটিং।
উঁচু র্যাঙ্কিংয়ের কোনো দলকে হারালে তুলনামূলকভাবে বেশি পয়েন্ট পাওয়া যায়। অন্যদিকে নিচের র্যাঙ্কিংয়ের দলকে হারালে একই পরিমাণ সুবিধা পাওয়া যায় না। এমনকি শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে ড্র করা একটি টেস্ট সিরিজও কখনো কখনো দুর্বল দলের বিপক্ষে সহজ সিরিজ জয়ের চেয়ে বেশি মূল্যবান হতে পারে।
প্রতিটি দ্বিপাক্ষিক সিরিজ বা আইসিসি টুর্নামেন্ট শেষ হওয়ার পর রেটিং নতুন করে হিসাব করা হয়। এ কারণেই বাংলাদেশ কোনো ম্যাচ না খেলেও র্যাঙ্কিংয়ে ওপরে বা নিচে যেতে পারে।
ধরুন, বাংলাদেশ তখন খেলছে না, কিন্তু শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তান নিজেদের মধ্যে একটি সিরিজ শেষ করেছে। সেই সিরিজের ফল বাংলাদেশের আশপাশে থাকা দলগুলোর রেটিং বদলে দিলে বাংলাদেশের অবস্থানও পরিবর্তিত হতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সাম্প্রতিক ফলাফল বেশি গুরুত্ব পায়। অনেক পুরোনো ম্যাচের প্রভাব ধীরে ধীরে কমে যায়। ফলে একটি দলের বর্তমান রেটিং মূলত গত দুই থেকে তিন বছরের পারফরম্যান্সের ছবি তুলে ধরে। এ কারণেই ভালো করতে থাকা একটি তরুণ দল তুলনামূলকভাবে দ্রুত র্যাঙ্কিংয়ে ওপরে উঠতে পারে।
তিন ফরম্যাটে বাংলাদেশের অবস্থান এত আলাদা কেন?
গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিং সাধারণত টেস্টের চেয়ে ভালো ছিল।
এর একটি বড় কারণ হলো দলের দ্রুত রান তুলতে পারে এমন ব্যাটার এবং শক্তিশালী স্পিন বোলিং আক্রমণ। বিশেষ করে বাংলাদেশের পরিস্থিতিে এই ধরনের দল ছোট ফরম্যাটে বেশ কার্যকর।
বিপিএল ও ডিপিএলের মতো ঘরোয়া টুর্নামেন্টও আক্রমণাত্মক ব্যাটিং এবং বৈচিত্র্যময় বোলিং দক্ষতা তৈরি করতে সাহায্য করেছে। আর এই দক্ষতাগুলো টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে সরাসরি কাজে লাগে।
অন্যদিকে টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের পথটা তুলনামূলক কঠিন। অনেক প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের তুলনায় বাংলাদেশ কম ঘরের মাঠের টেস্ট খেলে। পাশাপাশি বর্তমান বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ চক্রে দলের শুরুর ব্যাটিং সারিেও বেশ কয়েকজন তরুণ ব্যাটার নিজেদের জায়গা শক্ত করার চেষ্টা করছেন।
একটি ভালো টেস্ট দল তৈরি করতে সাধারণত টি-টোয়েন্টি দলের তুলনায় বেশি সময় লাগে। কারণ টেস্ট ক্রিকেটে দীর্ঘদিনের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের অভিজ্ঞতা খুব গুরুত্বপূর্ণ। ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া বা ভারতের মতো দেশের তুলনায় নতুন ক্রিকেট জাতি হিসেবে বাংলাদেশের সেই অভিজ্ঞতার পরিমাণ স্বাভাবিকভাবেই কম।
এটা শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়। অনেক নতুন টেস্ট খেলুড়ে দেশের ক্ষেত্রেই দেখা যায়, তাদের সাদা বলের দল তুলনামূলকভাবে দ্রুত ভালো অবস্থানে যায়, কিন্তু টেস্ট দলের গভীরতা তৈরি হতে আরও সময় লাগে।
র্যাঙ্কিংয়ে বড় উন্নতির জন্য কী দরকার?
টেস্ট র্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশকে উল্লেখযোগ্যভাবে ওপরে উঠতে হলে শক্তিশালী দলের বিপক্ষে বিদেশের মাটিতে ভালো ফল করতে হবে।
যেমন দক্ষিণ আফ্রিকা বা ইংল্যান্ডের মাটিতে সিরিজ জয়, কিংবা শক্ত লড়াই করে সিরিজ ড্র—এ ধরনের ফল বাংলাদেশের রেটিংয়ে অনেক বেশি প্রভাব ফেলবে। নিচের র্যাঙ্কিংয়ের দলের বিপক্ষে ঘরের মাঠে জয়ের তুলনায় এমন বিদেশের মাটিতে পারফরম্যান্সের মূল্য বেশি।
ছোট ফরম্যাটে আবার ধারাবাহিকতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ওডিআই ও টি-টোয়েন্টিতে বিভিন্ন ধরনের প্রতিপক্ষের বিপক্ষে নিয়মিত জিততে পারা একটি দলের রেটিংয়ের জন্য বড় বিষয়।
বাংলাদেশ সত্যিই কতটা এগোচ্ছে, সেটা বুঝতে চাইলে আইসিসি টুর্নামেন্টে দলের পারফরম্যান্সও নজরে রাখা দরকার।
দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দলগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ
দক্ষিণ এশিয়ার হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান মাঝামাঝি পর্যায়ে। বেশিরভাগ ফরম্যাটে আফগানিস্তানের চেয়ে এগিয়ে থাকলেও ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার তুলনায় বাংলাদেশ সাধারণত পিছিয়ে থাকে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন সিরিজের ফল বদলালেও এই সামগ্রিক চিত্র মোটামুটি একই থেকেছে। বিশেষ করে টেস্ট ক্রিকেটে এই ব্যবধান কমানো বাংলাদেশের ক্রিকেট বোর্ডের জন্য বড় লক্ষ্য।
তবে মনে রাখা দরকার, র্যাঙ্কিং হলো একটি দলের বর্তমান অবস্থার একটা মুহূর্তের চিত্র—এটাই দলের পুরো সামর্থ্যের চূড়ান্ত বিচার নয়। কোনো দল র্যাঙ্কিংয়ে প্রতিপক্ষের নিচে থেকেও সাম্প্রতিক মুখোমুখি ম্যাচগুলোতে তাদের বিপক্ষে ভালো রেকর্ড রাখতে পারে।
কারণ রেটিং শুধু একটি নির্দিষ্ট প্রতিপক্ষের বিপক্ষে ফল দেখে না, বরং সব দলের বিপক্ষে সামগ্রিক পারফরম্যান্স বিবেচনা করে।
সাধারণ দর্শকদের জন্য সহজভাবে বললে—র্যাঙ্ককে বর্তমান ফর্মের মোটামুটি ধারণা হিসেবে দেখুন, আর রেটিংকে তুলনামূলকভাবে নির্দিষ্ট হিসাব হিসেবে দেখুন। একটি বড় সিরিজের ফলের পরই সাধারণত উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসে। প্রতিটি ম্যাচের পর বড় পরিবর্তন হবে, এমন নয়।
র্যাঙ্কিং নিয়ে সাধারণ দর্শকদের যে ভুলগুলো হয়
অনেকে মনে করেন একটি ম্যাচ শেষ হলেই সঙ্গে সঙ্গে আইসিসি র্যাঙ্কিং বদলে যায়। আসলে সিস্টেমটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে একটি ম্যাচের ফলের কারণে খুব বেশি ওঠানামা না হয়। পুরো সিরিজের ফল এখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তাই কোনো দল সিরিজের প্রথম ম্যাচ হারলেও শেষ পর্যন্ত সিরিজ জিতলে তাদের সামগ্রিক রেটিং বাড়তে পারে।
আরেকটি সাধারণ ভুল হলো তিন ফরম্যাটের রেটিং সরাসরি তুলনা করা। টেস্টের রেটিং এবং ওডিআই বা টি-টোয়েন্টির রেটিং একই স্কেলে হিসাব করা হয় না।
তাই টেস্টে ৭৩ রেটিং এবং টি-টোয়েন্টিতে ২২৪ রেটিং দেখে সরাসরি বলা যাবে না যে একটি অন্যটির চেয়ে কতটা ভালো। ভিন্ন ফরম্যাট তুলনা করতে চাইলে সাধারণ দর্শকদের জন্য সরাসরি রেটিংয়ের চেয়ে র্যাঙ্কিংয়ের অবস্থান দেখাই সহজ।
প্রায়ই জিজ্ঞাসা করা প্রশ্ন
বাংলাদেশের তিন ফরম্যাটের অধিনায়ক কারা?
টেস্ট দলের অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত, ওডিআই দলের অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ এবং টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক দলের অধিনায়ক লিটন দাস।
আইসিসি র্যাঙ্কিং কতদিন পরপর আপডেট হয়?
কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি অনুযায়ী নয়। প্রতিটি দ্বিপাক্ষিক সিরিজ বা আইসিসি টুর্নামেন্ট শেষ হওয়ার পর রেটিং নতুন করে হিসাব করা হয়।
ভালো র্যাঙ্ক নাকি ভালো রেটিং—কোনটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ?
র্যাঙ্ক একটি দল কোথায় আছে সেটা বুঝতে সাহায্য করে। তবে রেটিং হলো তুলনামূলকভাবে আরও নির্দিষ্ট পরিমাপ।


