বাংলাদেশের অনূর্ধ্ব-১৯ কার্যক্রম গত এক দশকে দেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় অর্জনগুলোর একটি এনে দিয়েছে।
একই সঙ্গে এটিই ভবিষ্যতে সিনিয়র টাইগারদের জার্সি পরবে এমন খেলোয়াড়দের সবচেয়ে স্পষ্ট পথ। এই ব্যবস্থা কীভাবে কাজ করে, ২০২০ সালের বিশ্বকাপ শিরোপা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ ছিল এবং একজন তরুণ ক্রিকেটার কীভাবে অনূর্ধ্ব-১৯ থেকে সিনিয়র দলের দিকে এগিয়ে যায়—চলুন দেখে নেওয়া যাক।
২০২০ অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ জয় যেভাবে প্রত্যাশা বদলে দিয়েছে
বাংলাদেশ ২০২০ সালে আইসিসি অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট বিশ্বকাপ জেতে। ফাইনালে ভারতকে হারিয়ে বাংলাদেশ যেকোনো পর্যায়ে নিজেদের প্রথম আইসিসি শিরোপা অর্জন করে।
এই জয় দেশের যুব ক্রিকেট ব্যবস্থা নিয়ে প্রত্যাশাই বদলে দেয়। আগে সিনিয়র দলের তুলনায় অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট অনেকটাই উন্নয়ন কার্যক্রম হিসেবে পেছনে পড়ে থাকত।
কিন্তু বিশ্বকাপ জয়ের পর বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে কতটা সম্পদ এবং নজর দেওয়া দরকার, সেটা নতুনভাবে ভাবতে হয়।
প্রতিপক্ষ ভারত হওয়ায় এই জয়ের প্রতীকী গুরুত্ব আরও বড় ছিল। ভারতের খেলোয়াড়ের ভান্ডার ও ঘরোয়া কাঠামো বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বড়।
তারপরও বিশ্বমঞ্চের ফাইনালে ভারতকে হারানো দেখিয়ে দেয় বাংলাদেশের পরবর্তী প্রজন্ম শুধু একই ধরনের উন্নয়নশীল ক্রিকেট দেশের সঙ্গে নয়, অঞ্চলের সেরা প্রতিভার সঙ্গেও লড়তে পারে।
অনূর্ধ্ব-১৯ থেকে সিনিয়র দলে যাওয়ার পথ
খেলোয়াড়রা সাধারণত স্কুল ক্রিকেট এবং বয়সভিত্তিক ক্রিকেট থেকে শুরু করে বিসিবি পরিচালিত অনূর্ধ্ব-১৯ ক্যাম্প ও জাতীয় অনূর্ধ্ব-১৯ দলে আসে।
এই পর্যায়ে ঘরোয়া পারফরম্যান্স ভালো হলে ‘এ’ দলে নির্বাচনের সুযোগ তৈরি হয়। এরপর ধারাবাহিক ফর্ম থাকলে সিনিয়র আন্তর্জাতিক দলের জন্য বিবেচনা করা হয়।
বর্তমান সিনিয়র দলের অনেক ক্রিকেটারই এই এগিয়ে যাওয়ার পথ দিয়ে উঠে এসেছেন। এ কারণেই বিসিবি যুব ক্রিকেট কাঠামোতে বড় বিনিয়োগ চালিয়ে যাচ্ছে।
তবে সব খেলোয়াড় একই গতিতে এগোয় না। অনূর্ধ্ব-১৯ পর্যায়ে অসাধারণ খেললেও অনেকের সিনিয়র দলে যেতে কয়েক বছর লাগে।
প্রাপ্তবয়স্ক পর্যায়ের বোলিং ও ফিল্ডিংয়ের সঙ্গে মানিয়ে নিতে তাদের এনসিএল বা ডিপিএলে আরও কয়েক মৌসুম খেলতে হতে পারে। অন্যদিকে কিছু খেলোয়াড় তুলনামূলক দ্রুত উঠে আসে। বিশেষ করে যদি তাদের বোলিং বৈচিত্র্য বা ব্যাটিং ধরন সিনিয়র ক্রিকেটে খুব বেশি মানিয়ে নেওয়া ছাড়াই কার্যকর হয়।
বাংলাদেশের অনূর্ধ্ব-১৯ ব্যবস্থার বিশেষত্ব কী?
এশিয়ার কিছু দেশের তুলনায় বাংলাদেশের অনূর্ধ্ব-১৯ কার্যক্রমের একটি বড় সুবিধা হলো কেন্দ্রীভূত প্রতিভা শনাক্তকরণ ব্যবস্থা। বিসিবি নিজেই এই ব্যবস্থা পরিচালনা করে।
ফলে শুধু ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো বড় ক্রিকেটের প্রধান কেন্দ্রের খেলোয়াড়দের ওপর নির্ভর করতে হয় না। স্কুল ক্রিকেট টুর্নামেন্ট এবং আঞ্চলিক বয়সভিত্তিক প্রতিযোগিতা থেকেও প্রতিভা উঠে আসে।
এতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের নির্বাচকদের নজরে আসার সুযোগ বাড়ে।
কোচিংয়ের ধারাবাহিকতাও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উন্নত হয়েছে। অনেক অনূর্ধ্ব-১৯ কোচ আগে বিপিএল বা এনসিএল ব্যবস্থায় কাজ করেছেন।
ফলে তরুণ ক্রিকেটাররা এমন কোচিং পদ্ধতির সঙ্গে পরিচিত হয়, যা সিনিয়র পর্যায়ে ওঠার পরও অনেকটা একই থাকে। প্রতিটি ধাপে সম্পূর্ণ আলাদা কোচিং দর্শনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয় না।
এই ব্যবস্থা থেকে উঠে আসা কোন খেলোয়াড়দের দিকে নজর রাখবেন?
অনূর্ধ্ব-১৯-এর প্রতিটি চক্রেই নতুন কিছু নাম সামনে আসে। সাধারণত বয়সভিত্তিক টুর্নামেন্ট বা বিসিবি ক্যাম্পে নজরকাড়া পারফরম্যান্সের মাধ্যমেই তাদের প্রথম নজরে পড়ে।
ভবিষ্যতের নতুন উঠে আসা প্রতিভা আগে থেকে দেখতে চাইলে সবার পরিচিত নাম হওয়ার জন্য অপেক্ষা না করে ঘরোয়া অনূর্ধ্ব-১৯ প্রতিযোগিতার ফল অনুসরণ করা ভালো। কারণ ভালো অনূর্ধ্ব-১৯ মৌসুম থেকে সাধারণ মানুষের পরিচিত নাম হয়ে উঠতে দুই বা তিন বছরও লেগে যেতে পারে।
বাংলাদেশ আবার অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ জিতল কি না, শুধু সেটা দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার পথের সাফল্য বিচার করা হবে না।
বরং বর্তমান বয়সভিত্তিক পর্যায়ের খেলোয়াড়দের মধ্যে কতজন শেষ পর্যন্ত সিনিয়র আন্তর্জাতিক হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে পারেন, সেটাই সবচেয়ে বড় মাপকাঠি। ২০২০ বিশ্বকাপজয়ী দলকেও ধীরে ধীরে এই হিসাবেই বিচার করা হচ্ছে।
যুব ক্রিকেটে বিনিয়োগ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
অনূর্ধ্ব-১৯ থেকে এগিয়ে যাওয়ার পথে বিসিবির ধারাবাহিক বিনিয়োগের পেছনে আধুনিক ক্রিকেট প্রশাসনের একটি প্রতিষ্ঠিত ধারণা রয়েছে।
শক্তিশালী বয়সভিত্তিক ব্যবস্থা তৈরি করা সিনিয়র দলের জন্য গভীর প্রতিভার ভান্ডার গড়ার সবচেয়ে সাশ্রয়ী উপায়গুলোর একটি। শুধু দেরিতে বিকশিত ঘরোয়া খেলোয়াড়ের ওপর নির্ভর করলে দীর্ঘমেয়াদি ধারাবাহিকতা পাওয়া কঠিন।
যেসব দেশ বহু বছর ধরে শীর্ষ পর্যায়ের ক্রিকেটে শক্তিশালী থেকেছে, তারা সাধারণত সিনিয়র দল ভালো বা খারাপ যাই করুক—যুব ক্রিকেট উন্নয়নে নিয়মিত বিনিয়োগ ধরে রেখেছে।
বাংলাদেশের জন্য ২০২০ অনূর্ধ্ব-১৯ শিরোপা এই বিনিয়োগের গুরুত্বের বাস্তব প্রমাণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিসিবি কর্মকর্তারা এখন সিনিয়র আন্তর্জাতিক কার্যক্রম এবং দীর্ঘমেয়াদি বয়সভিত্তিক ক্রিকেট উন্নয়নের মধ্যে সম্পদ ভাগ করার সময় সেই অর্জনকে উদাহরণ হিসেবে দেখাতে পারেন।
অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেটের অগ্রগতির পথ কীভাবে অনুসরণ করবেন?
নিবেদিত ক্রিকেটভক্তদের মধ্যেও বয়সভিত্তিক ক্রিকেট অনুসরণ করা কিছুটা বিশেষ আগ্রহের। তবে যারা আগামী দশকের বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের সবার আগে চিনতে চান, তাদের জন্য অনূর্ধ্ব-১৯ টুর্নামেন্ট এবং বিসিবি যুব ক্যাম্প ঘোষণা সবচেয়ে সরাসরি উৎস।
স্কুল ও আঞ্চলিক বয়সভিত্তিক টুর্নামেন্ট থেকে জাতীয় অনূর্ধ্ব-১৯ কাঠামোতে খেলোয়াড় ওঠে। যেমন ক্লাব ক্রিকেট থেকে সিনিয়র ঘরোয়া কাঠামোতে খেলোয়াড় আসে।
ধৈর্য ধরে এই পর্যায় অনুসরণ করলে নতুন প্রতিভা মূলধারার আলোচনায় আসার অনেক আগেই চিনে ফেলার সুযোগ থাকে।
বাংলাদেশের সামগ্রিক ক্রিকেট অবকাঠামো যত উন্নত হবে, অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেটের এই কাঠামোর গুরুত্বও তত বাড়বে। একদিকে এটা জাতীয় গর্বের উৎস, অন্যদিকে ভবিষ্যতের টাইগাররা কতটা শক্তিশালী হতে পারে তার সবচেয়ে বাস্তব ইঙ্গিত।
শক্তিশালী অনূর্ধ্ব-১৯ ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি ফল
একটি বয়সভিত্তিক ক্রিকেট কার্যক্রমের সাফল্য শুধু একটি টুর্নামেন্ট জয় দিয়ে বিচার করা যায় না।
আসল পরীক্ষা হলো সেই কার্যক্রম থেকে উঠে আসা কতজন ক্রিকেটার দশ বছর বা তার বেশি সময় সিনিয়র আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্যারিয়ার গড়তে পারে।
সেই হিসাবে বাংলাদেশের অনূর্ধ্ব-১৯ ব্যবস্থার পুরো ফলাফল বুঝতে আরও কয়েক বছর লাগবে। ২০২০ বিশ্বকাপজয়ী দল এবং পরবর্তী প্রজন্মের ক্রিকেটাররা এখনো ঘরোয়া এবং সিনিয়র ক্রিকেটের মধ্য দিয়ে নিজেদের ক্যারিয়ার গড়ছেন।
তবে একটি বিষয় ইতিমধ্যেই পরিষ্কার। ২০২০ সালের জয়ের পর বাংলাদেশে বয়সভিত্তিক ক্রিকেট নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক নজর ও বিনিয়োগ মৌলিকভাবে বদলে গেছে।
আগে সিনিয়র দলের ছায়ায় থাকা একটি ব্যবস্থা এখন নিজেই কৌশলগত অগ্রাধিকার হয়ে উঠেছে। এই পরিবর্তনের সুফল আগামী দশকেও বাংলাদেশের ক্রিকেটে দেখা যেতে পারে।
প্রায়ই জিজ্ঞাসা করা প্রশ্ন
বাংলাদেশ কি কখনো আইসিসি অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ জিতেছে?
হ্যাঁ। ২০২০ সালে ফাইনালে ভারতকে হারিয়ে বাংলাদেশ নিজেদের প্রথম আইসিসি শিরোপা জেতে।
একজন খেলোয়াড় কীভাবে অনূর্ধ্ব-১৯ থেকে সিনিয়র দলে যায়?
সাধারণত অনূর্ধ্ব-১৯ পর্যায়ে ভালো ঘরোয়া পারফরম্যান্সের পর ‘এ’ দলে নির্বাচন আসে। এরপর ধারাবাহিক ফর্ম থাকলে সিনিয়র দলের জন্য বিবেচিত হয়।
বাংলাদেশের অনূর্ধ্ব-১৯ কার্যক্রম কে পরিচালনা করে?
বাংলাদেশের ক্রিকেট বোর্ড দেশের অন্যান্য ঘরোয়া কাঠামোর পাশাপাশি অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেটের পুরো কাঠামো পরিচালনা করে।


