ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয়ের প্রেক্ষাপট
2016 সালের 30 অক্টোবর মিরপুরে দ্বিতীয় টেস্টে ইংল্যান্ডকে 108 রানে হারিয়ে বাংলাদেশ তাদের বিপক্ষে প্রথম টেস্ট জয় পায় এবং দুই ম্যাচের সিরিজ 1-1 সমতায় শেষ করে। বাংলাদেশ 220 ও 296 রান করে; ইংল্যান্ডের প্রথম ইনিংস 244, আর 273 রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে তারা 164 রানে অলআউট হয়। ফলটি আরও বিস্ময়কর ছিল, কারণ চতুর্থ ইনিংসে 100 রান পর্যন্ত ইংল্যান্ডের কোনো উইকেট পড়েনি; চা-বিরতির পরই নামে ধস।
সিরিজের প্রথম ম্যাচই দেখিয়েছিল বাংলাদেশ ইংল্যান্ডকে চাপে ফেলতে পারে। চট্টগ্রামের প্রথম টেস্টে ইংল্যান্ড জিতেছিল মাত্র 22 রানে। তাই মিরপুরের ফল হঠাৎ কোথা থেকে আসা অঘটন ছিল না। বাংলাদেশ জানত তাদের স্পিন আক্রমণ ইংল্যান্ডের ব্যাটিংকে পরীক্ষায় ফেলতে পারে, তবে সেই সুবিধাকে নির্ণায়ক করতে যথেষ্ট রান ও সময়ও দরকার ছিল। ব্যবহারযোগ্য লক্ষ্য ও অবিরাম স্পিনের চাপ—দুটির সমন্বয়েই আসে জয়।
প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশের ভরসা ছিলেন তামিম ইকবাল
বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসের 220 রান মূলত ধরে রাখেন তামিম ইকবাল; 147 বলে তিনি করেন 104। মুমিনুল হক 66 রান করেন, তবে ইংল্যান্ডের মঈন আলী 57 রানে পাঁচ উইকেট নিয়ে স্বাগতিকদের আরও বড় সংগ্রহ গড়তে দেননি। যে পিচে স্পিনের প্রভাব বাড়তেই থাকত, সেখানে সাধারণ টেস্ট মানদণ্ডে 220 খুব বড় স্কোর ছিল না। এর মূল্য নির্ভর করছিল বাংলাদেশ ইংল্যান্ডকে কতটা কাছাকাছি রাখতে পারে, যাতে দ্বিতীয় ইনিংস অর্থবহ থাকে।
তামিমের শতক গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কারণ সেটি ইনিংসকে বিচ্ছিন্ন কিছু ভালো শুরুর বদলে দৃঢ়তা দিয়েছিল। স্পিনের বিপক্ষে জমে যাওয়া ব্যাটার নতুন ব্যাটারের তুলনায় হাত থেকে বলের গতি ও পিচের আচরণ ভালো বুঝতে পারেন, তাই টার্ন থাকা পিচে দীর্ঘ সময় ক্রিজে থাকার মূল্য বেশি। তাঁর ইনিংস নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করেনি, কিন্তু বোলারদের কাজ করার মতো সংগ্রহ দিয়েছিল। এটি না হলে ইংল্যান্ড এমন লিড নিতে পারত, যা ম্যাচের গতিপথই বদলে দিত।
ইংল্যান্ডের প্রথম ইনিংসের লিড ছোট রাখেন মেহেদী হাসান মিরাজ
ইংল্যান্ড 244 করে মাত্র 24 রানের লিড নেয়। পিছিয়ে থাকলেও এত ছোট ব্যবধান বাংলাদেশকে ম্যাচে পুরোপুরি রেখেছিল। টেস্ট ক্যারিয়ারের শুরুতেই থাকা মেহেদী হাসান মিরাজ সফরকারীদের পালিয়ে যেতে না দেওয়ার কেন্দ্রে ছিলেন। ম্যাচে তিনি শেষ পর্যন্ত 159 রানে 12 উইকেট নেন; পিচের সহায়তাকে শুধু রান আটকে রাখায় নয়, ধারাবাহিক উইকেট নেওয়ায় রূপ দেন।
সহায়ক পিচে স্পিনারকেও কারিগরি সমস্যা সমাধান করতে হয়। অতিরিক্ত টার্ন ব্যাটের কানা এড়িয়ে যেতে পারে, আবার অনিয়মিত গতি ব্যাটারকে পেছনের পায়ে স্থির হতে সাহায্য করে। বোলারকে বারবার ব্যাটের দুই কানা, স্টাম্প এবং কাছের ক্যাচারদের খেলায় আনতে হয়। মিরাজের মূল্য ছিল এখানেই যে ইংল্যান্ড শুধু একটি বিপজ্জনক স্পেল শেষ হওয়ার অপেক্ষায় থাকতে পারেনি। বাংলাদেশ তাঁকে বারবার আক্রমণে এনে প্রশ্ন করতে পেরেছিল, ফলে সফরকারীরা বড় প্রথম ইনিংসের সুবিধা গড়তে পারেনি।
দ্বিতীয় ইনিংস এমন লক্ষ্য গড়ে, যার মানসিক ওজন ছিল
দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশ 296 রান করে ইংল্যান্ডকে 273 রানের লক্ষ্য দেয়। লক্ষ্যটি এত বড় ছিল যে প্রতিটি আক্রমণাত্মক শটের মূল্য দিতে হতো, আবার এত বড়ও ছিল না যে ইংল্যান্ড শুরু থেকেই জয়ের আশা ছেড়ে দেবে। অর্থাৎ ঘরের মাঠের স্পিন আক্রমণ যে ধরনের চতুর্থ ইনিংসের টানটান পরিস্থিতি কাজে লাগাতে পারে, ঠিক সেটিই তৈরি হয়েছিল। বল একেক ডেলিভারিতে একেকভাবে আচরণ করতে পারে এমন পিচে ইংল্যান্ডকে রানও করতে হতো, উইকেটও বাঁচাতে হতো।
ক্ষয়িষ্ণু পিচে প্রায় 250 থেকে 300 রানের লক্ষ্য টেস্টে বিশেষ ধরনের গতিশীলতা তৈরি করে। ব্যাটিং দল জয়ের পথ দেখতে পায় বলে ইতিবাচক মনোভাব থাকে, কিন্তু অল্প সময়ে কয়েকটি উইকেট পড়লেই লক্ষ্য তাড়ার চেহারা বদলে যায়। বাংলাদেশের দরকার ছিল না ইংল্যান্ড শুরু থেকেই রক্ষণাত্মক হবে; দরকার ছিল স্টাম্প ও ব্যাট-প্যাড অঞ্চলে আক্রমণ চালিয়ে যাওয়া, যতক্ষণ না পিচ ও স্কোরবোর্ডের চাপ মিলে ভুল তৈরি করে। তবে লক্ষ্য তাড়ার প্রথম সেশন সেই চিত্র অনুসরণ করেনি।
বিনা উইকেটে 100 থেকে 164 রানে অলআউট
বেন ডাকেট ও অ্যালিস্টার কুক উদ্বোধনী জুটিতে 100 রান তোলেন; ডাকেট 56 ও কুক 59 করেন। চা-বিরতিতে সফরকারীদের হাতে সব 10 উইকেটই ছিল এবং লক্ষ্য নাগালের মধ্যে মনে হচ্ছিল। এরপর ঘটে বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসের অন্যতম তীক্ষ্ণ মোড়। মাত্র 64 রানের মধ্যে ইংল্যান্ড সব 10 উইকেট হারিয়ে 164 রানে অলআউট হয়; দুই দিন বাকি থাকতেই বাংলাদেশ জেতে।
এই ধস দেখায়, চতুর্থ ইনিংসে একসঙ্গে কয়েকটি উইকেট কত শক্তিশালী প্রভাব ফেলে। নতুন ব্যাটারকে পিচ বুঝে নিতে হয়, আর ফিল্ডিং দল আরও আক্রমণাত্মক হয় ও দর্শকের চাপ বাড়ে। দ্রুত আরেকটি উইকেট পড়লে পরের ব্যাটার আরও অনিশ্চয়তার মধ্যে শুরু করেন। বাংলাদেশ দুই প্রান্ত থেকে স্পিন ও কাছের ক্যাচার ব্যবহার করে সেই চক্র ধরে রাখে। প্রথম উইকেট পড়ার পর ইংল্যান্ড আর দীর্ঘ জুটি গড়ে লক্ষ্য তাড়াকে স্থির করতে পারেনি।
মিরাজ ও সাকিব ভিন্নভাবে আক্রমণ করেন
দ্বিতীয় ইনিংসে মিরাজ 77 রানে ছয় উইকেট এবং সাকিব আল হাসান 49 রানে চার উইকেট নেন। দুজন বাংলাদেশকে পরস্পর-পরিপূরক হুমকি দেন। মিরাজের অফ স্পিন লাইন ও ফ্লাইট বদলে বাঁহাতি-ডানহাতি দুই ধরনের ব্যাটারকেই পরীক্ষা করেছে; সাকিবের বাঁহাতি স্পিন এসেছে ভিন্ন রিলিজ পয়েন্ট ও কোণ থেকে। পালা করে এই ভিন্ন প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ায় ব্যাটারদের এক ধরনের রক্ষণভঙ্গিতে স্থির হওয়া কঠিন হয়।
সংখ্যাগুলো আরও দেখায়, শেষ ইনিংসে বাংলাদেশের বড় পেস অবদান দরকার হয়নি। সব উইকেটই নিয়েছেন দুই স্পিনারের একজন। এর মানে এই নয় যে ম্যাচে পেস অপ্রাসঙ্গিক ছিল বা ঘরের মাঠে সব সময় স্পিনই বাংলাদেশের কৌশল হওয়া উচিত। বরং ওই দিন পরিস্থিতি ও ম্যাচের অবস্থাই 10 উইকেট নেওয়ার সবচেয়ে সরাসরি পথ হিসেবে স্পিনকে সামনে এনেছিল। অধিনায়কত্বের সিদ্ধান্ত ছিল শুধু ভারসাম্যের জন্য ওভার ভাগ না করে সেই সুবিধাকে নিরন্তর কাজে লাগানো।
কেন এটি শুধু স্পিন-সহায়ক পিচের গল্প নয়
ফলটিকে শুধু টার্নিং মিরপুর পিচের ফল বলে দেওয়া সহজ, কিন্তু তাতে রক্ষা করার মতো ম্যাচ অবস্থান তৈরির কাজটি আড়াল হয়ে যায়। বাংলাদেশের এখনও দরকার ছিল তামিমের প্রথম ইনিংসের শতক, 220-এ পৌঁছাতে নিম্নক্রমের যথেষ্ট প্রতিরোধ, ইংল্যান্ডের লিড 24-এ আটকে রাখা বোলিং এবং দ্বিতীয় ইনিংসে 296। ব্যাটিং দল রান দিলে এবং বোলাররা 20 উইকেট নেওয়ার মতো ধারাবাহিক প্রয়োগ করতে পারলেই সহায়ক পিচ সত্যিকারের সম্পদে পরিণত হয়।
বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের জন্য বড় শিক্ষা হলো, খেলোয়াড়, পরিস্থিতি ও স্কোরবোর্ডের চাপকে এক সুতোয় বাঁধা। 2016 সালের দল বুঝেছিল ধারাবাহিক উচ্চমানের স্পিনে ইংল্যান্ডকে চাপে ফেলা যায়; এরপর এমন ম্যাচ অবস্থান তৈরি করেছিল যেখানে সেই শক্তি ফল নির্ধারণ করতে পারে। এই জয় প্রমাণ করেনি যে ঘরের মাঠের এক সূত্র চিরকাল কাজ করবে। বরং বাস্তব একটি সুবিধা চিহ্নিত করে পুরো টেস্টকে এমনভাবে সাজানোর মূল্য দেখিয়েছে, যাতে সেই সুবিধা যথেষ্টবার প্রভাব ফেলতে পারে।
ম্যাচটি আরও দেখায়, মৌলিক বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকলেই ঘরের মাঠের সুবিধা সবচেয়ে শক্তিশালী হয়। প্রতিটি বলে পিচ কতটা টার্ন করবে তা বাংলাদেশ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি, কিন্তু লেংথ, ক্যাচিং পজিশন, ব্যাটিং জুটি এবং ইনিংস ঘোষণার প্রয়োজন না পড়া সময় ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছিল। এই নিয়ন্ত্রণযোগ্য বিষয়গুলোই স্পিনের সুবিধাকে কেবল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ টেস্ট নয়, 108 রানের জয়ে রূপ দেয়।


