Sponsored by

বাংলাদেশ বনাম ইংল্যান্ড 2015 বিশ্বকাপ: অ্যাডিলেড জয়ের বিশ্লেষণ

2015 ক্রিকেট বিশ্বকাপে অ্যাডিলেড ওভালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে উইকেট উদ্‌যাপনরত বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা

কেন অ্যাডিলেড হয়ে উঠেছিল বিশ্বকাপের ঐতিহাসিক এক রাত

2015 সালের 9 মার্চ অ্যাডিলেড ওভালে ইংল্যান্ডকে 15 রানে হারিয়ে প্রথমবারের মতো ক্রিকেট বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নেয় বাংলাদেশ। মাহমুদউল্লাহর 103 ও মুশফিকুর রহিমের 89 রানে বাংলাদেশ 7 উইকেটে 275 করে; জবাবে ইংল্যান্ড 48.3 ওভারে 260 রানে অলআউট হয়। রুবেল হোসেন 53 রানে চার উইকেট নেন, যার মধ্যে ছিল শেষ দুই উইকেট—যে মুহূর্তেই নিশ্চিত হয় টুর্নামেন্টের বড় তাৎপর্যপূর্ণ ফলটি।

যোগ্যতা অর্জনের ফল পরিষ্কার ছিল বলেই ম্যাচটি স্মরণীয়, তবে ক্রিকেটীয় দিকটিও আরও গভীরভাবে দেখার মতো। বাংলাদেশ সহজ অবস্থান থেকে জেতেনি। ইনিংসের শুরুতেই 8 রানে 2 উইকেট হারিয়ে বড় গতির বোলিং আক্রমণের বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়াতে হয়েছিল; পরে এমন মাঠে সংগ্রহ রক্ষা করতে হয়, যেখানে ইংল্যান্ডের হাতে লক্ষ্য তাড়ার জন্য যথেষ্ট সময় ও উইকেট ছিল। জয় আসে পুনর্গঠন, জুটি গড়া এবং ইংল্যান্ডের ম্যাচের গতি বারবার থামিয়ে দেওয়া বোলিং পরিকল্পনার সমন্বয়ে।

8 রানে 2 উইকেটের ধাক্কা সামলে জমে না যাওয়া

ওয়ানডে ব্যাটিংয়ে শুরুর উইকেট পড়লে দুই ধরনের ভুল হতে পারে। একটি দল কিছুই হয়নি এমনভাবে আক্রমণ চালিয়ে আরও উইকেট হারাতে পারে; আবার অতিরিক্ত রক্ষণাত্মক হয়ে রান তোলার গতি একেবারে থামিয়েও দিতে পারে। দুই ওপেনারকে দ্রুত হারানোর পর বাংলাদেশের দরকার ছিল মাঝামাঝি পথ। সৌম্য সরকারের 40 রান ইনিংসকে স্থবির হতে দেয়নি, আর মাহমুদউল্লাহর সঙ্গে তাঁর জুটি ইংল্যান্ডকে পুরো নিয়ন্ত্রণ না দিয়েই পুনর্গঠনের কাজ শুরু করে।

নতুন বল তখনও হুমকি দিচ্ছিল বলে এই পর্যায়টি ছিল গুরুত্বপূর্ণ। শুধু টিকে থাকলেই যথেষ্ট হবে—বাংলাদেশ এমন ধরে নিতে পারেনি। অ্যাডিলেডে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ বিশ্বকাপ সংগ্রহের জন্য এমন ভিত্তি দরকার ছিল, যেখান থেকে মধ্যক্রম পরে রান তোলার গতি বাড়াতে পারে। প্রান্ত বদল এবং বোলার ভুল করলে রান নেওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে ইংল্যান্ডের সমস্যাটিই বদলে দেয়। ফিল্ডিং দল দ্রুত তৃতীয় উইকেট খোঁজার অবস্থা থেকে এমন এক জুটি সামলাতে যায়, যা স্কোর ও বাংলাদেশের আত্মবিশ্বাস দুটিই ফিরিয়ে আনছিল।

মাহমুদউল্লাহর শতক ছিল ওয়ানডে ইনিংসের গতি নিয়ন্ত্রণের পাঠ

মাহমুদউল্লাহর 103 ছিল পুরুষদের ক্রিকেট বিশ্বকাপে কোনো বাংলাদেশি ব্যাটারের প্রথম শতক। মাইলফলকটি ঐতিহাসিক, কিন্তু ইনিংসটির কৌশলগত মূল্য ছিল আরও বড়। ক্ষতিগ্রস্ত ইনিংসে এসে তাঁকে ছোট পাল্টা আক্রমণের বদলে দীর্ঘ সময় ঝুঁকি মেপে খেলতে হয়েছিল। তাঁর কাজ ছিল নিশ্চিত করা, পুরোনো বল ও শেষের ওভারগুলো যখন বেশি রান করার সুযোগ দেবে, তখনও যেন বাংলাদেশের স্বীকৃত ব্যাটার ক্রিজে থাকে।

সঠিক গতিতে খেলা একটি ওয়ানডে শতকের ভেতরে প্রায়ই কয়েকটি আলাদা ইনিংস থাকে। কখনো সেরা বলগুলো ছেড়ে দেওয়া বা রক্ষা করা, কখনো কম ঝুঁকিতে প্রান্ত বদল, আবার কখনো বাউন্ডারির সুযোগ বাড়লে গতি তোলা। মাহমুদউল্লাহর ইনিংস বাংলাদেশকে এই ধাপগুলো পার হতে দেয়। তিনি এতক্ষণ টিকে তিন অঙ্কে পৌঁছেছিলেন যে ইংল্যান্ড নতুন ব্যাটারের ধারাবাহিক আগমনকে আক্রমণ করার সুযোগ পায়নি। বাংলাদেশের ঘুরে দাঁড়াতে যে ধারাবাহিকতা দরকার ছিল, সেটিই তৈরি করে তাঁর ইনিংস।

মাহমুদউল্লাহ-মুশফিক জুটি সম্ভাব্য সংগ্রহের সীমা বদলে দেয়

ইংল্যান্ডের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর জুটি ছিল পঞ্চম উইকেটে মাহমুদউল্লাহ ও মুশফিকুর রহিমের 141 রান। মুশফিক 89 করে ভিত্তি শক্ত হওয়ার সঙ্গে ইনিংসকে আরও বিস্তৃত রান তোলার সামর্থ্য দেন। পুনর্গঠনের জুটি তখনই সত্যিকারের মূল্যবান, যখন তা শুধু ক্ষতি মেরামত করে থেমে থাকে না; সম্ভাব্য চূড়ান্ত সংগ্রহও বাড়িয়ে দেয়। এই জুটি বাংলাদেশকে 230-এর মতো গ্রহণযোগ্য সংগ্রহের পথ থেকে 275-এর পর্যায়ে নিয়ে যায়।

দুই জমে যাওয়া ব্যাটার প্রান্ত বদল করতে থাকায় ইংল্যান্ডকে ফিল্ড ও লেংথ বদলাতে হয়। অধিনায়ক তখন সব ক্যাচার ভেতরে রাখতে পারেন না। বাউন্ডারিতে সুরক্ষা বাড়লে এক রান সহজ হয়, আর বোলাররা অনেক সময় একই লাইন বারবার করার বদলে বিশেষ কিছু করার চেষ্টা করেন। বাংলাদেশ এই পরিবর্তনের সুবিধা পায়। মাহমুদউল্লাহ আউট হওয়ার পরও আগের কাজ এতটাই এগিয়ে ছিল যে নিম্নক্রমকে আবার ইনিংস গড়ার বদলে শেষ দিকে দরকারি রান যোগ করলেই চলত।

কেন 275 ছিল রক্ষা করার মতো, কিন্তু স্বস্তিদায়ক নয়

276 রানের লক্ষ্য ইংল্যান্ডকে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেয়নি। ইয়ান বেল 63 এবং পরে জস বাটলার 65 করায় লক্ষ্য তাড়া বারবার নতুন প্রাণ পায়। তাই প্রয়োজনীয় রান রেট খুব বেড়ে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকলে চলত না; উইকেটের চাপ দিয়েই বাংলাদেশকে সংগ্রহ রক্ষা করতে হতো। এখানেই পেস আক্রমণের গুরুত্ব। জমে যাওয়া ব্যাটাররা পুরো নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার আগে বোলারদের ইংল্যান্ডকে বারবার নতুন জুটি শুরু করতে বাধ্য করতে হয়েছিল।

ইংল্যান্ডের আটটি উইকেটই নেন বাংলাদেশের পেসাররা। তাসকিন আহমেদ গুরুত্বপূর্ণ ব্যাটারদের ফেরান, আর নির্ণায়ক চার উইকেটের স্পেল করেন রুবেল। অ্যাডিলেডে পেসকে সফলভাবে ব্যবহার করার মধ্যেও বড় বার্তা ছিল। ঘরের মাঠে বাংলাদেশকে প্রায়ই স্পিনের সঙ্গে যুক্ত করা হতো, কিন্তু এই বিশ্বকাপ ছিল অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে, যেখানে সিমারদের ভূমিকা বড় হতে পারে। মিরপুরের ধরন নকল করার চেষ্টা না করে আক্রমণ পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছিল।

রুবেল হোসেনের শেষ স্পেল ও চাপের মধ্যে নিখুঁত প্রয়োগ

শেষের অংশটিই অধিকাংশ সমর্থকের মনে সবচেয়ে বেশি আছে। শেষ ওভারগুলো শুরু হওয়ার সময়ও ইংল্যান্ড ম্যাচে ছিল, তাই বাংলাদেশ ঢিলেঢালা প্রয়োগের সুযোগ পায়নি। 49তম ওভারে রুবেল হোসেন স্টুয়ার্ট ব্রড ও জেমস অ্যান্ডারসনকে আউট করে ইংল্যান্ডের ইনিংস 260 রানে শেষ করেন। তাঁর 53 রানে চার উইকেট ম্যাচকে নাটকীয় সমাপ্তির ছবি দেয়, তবে সেই উইকেটগুলোর মূল্য ছিল কারণ আগের চাপ ইংল্যান্ডকে তার আগেই লক্ষ্য শেষ করতে দেয়নি।

নকআউটসদৃশ চাপের মধ্যে শেষের ওভারে বোলিং শুধু ইয়র্কার বেছে নেওয়ার বিষয় নয়। বোলারকে ব্যাটারের সম্ভাব্য রান তোলার এলাকা বুঝতে হয়, সাজানো ফিল্ড কাজে লাগাতে হয় এবং ভুলের পরিণতি জেনেও ঠিক লেংথে আস্থা রাখতে হয়। রুবেলের গতি ও স্টাম্প লক্ষ্য করে সরাসরি আক্রমণ ইংল্যান্ডের হাতে খুব কম সুযোগ থাকা অবস্থায় পরিষ্কারভাবে বড় শট খেলা কঠিন করে তোলে। শেষ উইকেটগুলো বাংলাদেশের ভালো নৈপুণ্যকে নিশ্চিত যোগ্যতা অর্জনের ফলে রূপ দেয়।

বাংলাদেশের ওয়ানডে পরিণতিবোধ সম্পর্কে এই জয়ের বার্তা

অ্যাডিলেডের জয় বিশ্লেষণের জন্য মূল্যবান, কারণ বাংলাদেশ কয়েকটি পরস্পর-সংযুক্ত দক্ষতার মাধ্যমে জিতেছিল। শীর্ষক্রম শুরুর ধাক্কা সামলে নেয়, মধ্যক্রম দীর্ঘ জুটি গড়ে, সংগ্রহকে কেবল পুনর্গঠনের সীমা পেরিয়ে বড় করা হয়, আর বোলাররা উইকেট নিয়ে সেটি রক্ষা করেন। কোনো একটি পর্যায় একা পুরো ফল ব্যাখ্যা করতে পারে না। মাহমুদউল্লাহর শতক, মুশফিকের গতি বাড়ানো কিংবা রুবেলের উইকেট—যেকোনো একটি বাদ দিলে ম্যাচের চেহারা অনেকটাই বদলে যায়।

বাংলাদেশের সমর্থকদের জন্য এ কারণেই ম্যাচটি শুধু স্মরণীয় দৃশ্যের সংকলনের চেয়ে বেশি শিক্ষণীয়। একই ম্যাচের ভেতরে ভিন্ন ভিন্ন ওয়ানডে সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম একটি দলকে দেখা গিয়েছিল। প্রথম পরিকল্পনা ব্যর্থ হলে ঘুরে দাঁড়িয়ে জয়ের নতুন পথ তৈরি করতে পেরেছিল বলেই বাংলাদেশ কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে। শেষ উইকেটের আবেগের চেয়েও এই অভিযোজনক্ষমতাই বাংলাদেশের বিশ্বকাপ যাত্রায় অ্যাডিলেডকে বড় পদক্ষেপে পরিণত করেছিল।

ম্যাচটি এখনও প্রাসঙ্গিক থাকার আরেকটি কারণ হলো, এটি ভূমিকার স্বচ্ছতার মূল্য দেখায়। বাংলাদেশ প্রত্যেক ব্যাটারকে একই গতিতে রান করতে বা প্রত্যেক বোলারকে একইভাবে আক্রমণ করতে বলেনি। ইনিংসে ছিল পুনর্গঠনকারী ও গতি বাড়ানো ব্যাটার; আর সংগ্রহ রক্ষায় উইকেটের মাধ্যমে লক্ষ্য তাড়াকে অস্থির রাখা হয়েছিল। বাংলাদেশের জন্য এটি পুনরাবৃত্তিযোগ্য ওয়ানডে নীতি: পর্যায়ভিত্তিক দায়িত্ব ঠিক করুন, এরপর মূল পরিকল্পনা বিঘ্নিত হলে খেলোয়াড়দের মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ দিন।

Related posts

ইডেন গার্ডেন্সে আলোর নিচে গোলাপি বল দিয়ে 2019 সালের দিবা-রাত্রির টেস্ট খেলছে বাংলাদেশ ও ভারত

মানিয়ে নেওয়ার খুব কম সুযোগ নিয়ে এসেছিল ঐতিহাসিক প্রথম অভিজ্ঞতা 22 নভেম্বর

প্যাভিলিয়নে ব্যাটাররা প্রস্তুত থাকার সময় কখন ইনিংস ঘোষণা করবেন তা ভাবছেন টেস্ট অধিনায়ক

নিজেদের ইনিংস শেষ করার বৈধ উপায় হলো ইনিংস ঘোষণা টেস্ট ক্রিকেটে একটি

ক্রিকেট বল ছাড়ার আগে নন-স্ট্রাইকার প্রান্তে রান আউটের চেষ্টা করছেন বোলার

আইন অনুযায়ী এই আউটের ধরন রান আউট নন-স্ট্রাইকার আগেভাগে ক্রিজ ছেড়ে গেলে

Recent Posts

ইডেন গার্ডেন্সে আলোর নিচে গোলাপি বল দিয়ে 2019 সালের দিবা-রাত্রির টেস্ট খেলছে বাংলাদেশ ও ভারত

ব্লগ শিরোনাম: বাংলাদেশের প্রথম দিবা-রাত্রির টেস্ট: 2019 সালের গোলাপি বলের ম্যাচ যা শিখিয়েছিল

মানিয়ে নেওয়ার খুব কম সুযোগ নিয়ে এসেছিল ঐতিহাসিক প্রথম অভিজ্ঞতা 22 নভেম্বর 2019 থেকে কলকাতার

Read More
ক্রিকেট বল ছাড়ার আগে নন-স্ট্রাইকার প্রান্তে রান আউটের চেষ্টা করছেন বোলার

ব্লগ শিরোনাম: নন-স্ট্রাইকার রান আউটের নিয়ম: বাংলাদেশের ক্রিকেট সমর্থকদের যা জানা দরকার

আইন অনুযায়ী এই আউটের ধরন রান আউট নন-স্ট্রাইকার আগেভাগে ক্রিজ ছেড়ে গেলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে বোলার

Read More
লাল বলের কন্ডিশনে চার দিনের জাতীয় ক্রিকেট লিগের ম্যাচ খেলছেন বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটাররা

ব্লগ শিরোনাম: বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট লিগ: টেস্ট উন্নয়নে চার দিনের ক্রিকেট কেন গুরুত্বপূর্ণ

বাংলাদেশের সাদা বলের প্রতিযোগিতা থেকে এনসিএলের উদ্দেশ্য কেন আলাদা জাতীয় ক্রিকেট লিগ বাংলাদেশের ঘরোয়া কাঠামোর

Read More
টেস্ট ম্যাচে পুরোনো লাল বল ব্যবহার করছেন বাংলাদেশের পেসার, আর ফিল্ডাররা বলের ঔজ্জ্বল্য বজায় রাখছেন

ব্লগ শিরোনাম: টেস্ট ক্রিকেটে রিভার্স সুইং: বাংলাদেশের জন্য পুরোনো বলের দক্ষতা কেন গুরুত্বপূর্ণ

নতুন বল সাহায্য করা বন্ধ করলে রিভার্স সুইং কেন গুরুত্বপূর্ণ নতুন বলের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রচলিত

Read More
টেস্ট ম্যাচে বাংলাদেশের হয়ে বাঁহাতি স্পিন বোলিং করছেন তাইজুল ইসলাম

ব্লগ শিরোনাম: টেস্ট ক্রিকেটে তাইজুল ইসলাম: তার বাঁহাতি স্পিনকে যেভাবে ব্যবহার করে বাংলাদেশ

তাইজুলের টেস্ট ভূমিকা সাধারণ বাঁহাতি স্পিনের চেয়ে কেন আলাদা টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের জন্য তাইজুল ইসলামের

Read More
Scroll to Top